সমতট ও কমলাঙ্ক নগর

বৌদ্ধধর্মের প্রভাবশালী যুগে বর্তমান বাংলাদেশ চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল: সমতট, পুণ্ড্রবর্ধন, কর্ণসুবর্ণ ও তাম্রলিপ্ত। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট স্মিথের মতে, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, সিলেট এবং ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলার বড় অংশ নিয়ে সমতট গঠিত ছিল। এর নগরগুলোর মধ্যে কমলাঙ্ক নামের একটি নগর ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ; এটি কুমিল্লা জেলার পট্টিকেরা রাজ্যে অবস্থিত ছিল। লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণির পশ্চিম দিকে পট্টিকেরা নামের একটি পরগনা আজও আছে, যা পট্টিকেরা রাজ্যের স্মৃতি বহন করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পট্টিকেরা রাজ্যের সঙ্গে বার্মার রাজবংশের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল।

কমলাঙ্ক ছিল পট্টিকেরা রাজ্যের রাজধানী, যদিও কালের পরিক্রমায় এর সঠিক অবস্থান বদলেছে। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে তিন মাস কমলাঙ্কে অবস্থান করেন এবং এ অঞ্চলের বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে আরও দুজন চীনা পরিব্রাজক, ই-ৎসিং ও চেং শি, এ অঞ্চলের বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আসেন এবং তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্তে সে কথা লিখে গেছেন।

কমলাঙ্ক নামের উৎপত্তি

কমলাঙ্ক নামটির উৎপত্তি মহাযানী বৌদ্ধদের উপাস্য দেবী কমলা থেকে, যিনি কমলাঙ্ক নগরে অধিষ্ঠিত ছিলেন বলে মনে করা হতো। যুগে যুগে নামটি বদলেছে: বৌদ্ধযুগে কমলাঙ্ক, পর্তুগিজ আমলে কমলা, ব্রিটিশ আমলের শুরুতে কমিলা, পরে কুমিলা, আর আজ কুমিল্লা, যে নাম এখনো তার পুরোনো নামকে ধারণ করে আছে।

কথিত আছে, খড়্গ, দেব, চন্দ্র ও পাল রাজবংশের প্রায় শতাধিক রাজা এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছেন। অঞ্চলটির বিশালতা ও ঐতিহ্যের সমৃদ্ধির কারণে সমতট রাজ্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লিখতে গেলে বিশাল গ্রন্থ হয়ে যাবে। বৌদ্ধধর্ম ছাড়াও হিন্দু ও জৈনধর্মের জন্যও কুমিল্লার ইতিহাস মহান ও গৌরবময়। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে এখানে আমি বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে লালমাই-ময়নামতি অঞ্চল সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনার চেষ্টা করব।

১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে লালমাই-ময়নামতির প্রত্নস্থলে যে খননকাজ শুরু হয়েছিল, তা আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে এই খনন ও এর আবিষ্কারগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে একের পর এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করে চলেছে। লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের উঁচু ঢিবিগুলো কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় পাঁচ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত। বিক্ষিপ্ত টিলাগুলো এমন এক পাহাড়শ্রেণির অংশ, যা উত্তরে ময়নামতি থেকে দক্ষিণে লালমাই রেলস্টেশন পর্যন্ত বিস্তৃত, দৈর্ঘ্যে প্রায় ১১ মাইল ও প্রস্থে দেড় মাইল। পুরো পাহাড়শ্রেণিতে খননের জন্য নির্বাচিত ২০টি প্রত্নস্থলের মধ্যে এ পর্যন্ত অল্প কয়েকটিতেই খনন হয়েছে, যেমন শালবন বিহার, ইটাখোলা মুড়া, রূপবান মুড়া, আনন্দ বিহার, চারপত্র মুড়া, কোটিলা মুড়া (ত্রিরত্ন স্তূপ), ভোজ বিহার ও লতিকোট মুড়া। বাকিগুলো অপেক্ষার তালিকায়।

একবার (তারিখ ও সাল আমার মনে নেই) ঢাকা জাদুঘরের প্রধান কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টশালী, মহান ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং বিশিষ্ট পণ্ডিত রাসমোহন চক্রবর্তীকে নিয়ে গঠিত একটি দল লালমাই-ময়নামতি পাহাড়শ্রেণির সব ধ্বংসাবশেষ ও নিচু জায়গা জরিপ করে একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। শ্রদ্ধেয় রাসমোহন চক্রবর্তীর কাছ থেকে পাওয়া সেই জরিপ তালিকাই এই লেখার মূল উৎস। ১৯৫৫ সালে এই তালিকার ভিত্তিতে আমি একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যা কলকাতার সুপরিচিত পত্রিকা জগজ্জ্যোতি-তে প্রকাশিত হয়। এখানে আমি একটু বিস্তারিতভাবে লেখার চেষ্টা করেছি।

রানী ময়নামতি ও ময়নামতি টিলা

বিক্ষিপ্ত এই টিলাগুলো ময়নামতি গ্রামের কাছে, ঢাকা-ময়নামতি সড়কের মোড় থেকে সামান্য উত্তরে অবস্থিত। এসব ঢিবির ধ্বংসস্তূপ থেকে বিভিন্ন ধর্ম ও যুগের প্রত্নবস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রত্নবস্তুর পাশাপাশি এখানে একজন জৈন তীর্থঙ্করের পাথরের মূর্তিও পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এখানে জৈনধর্মেরও চর্চা ছিল। ধর্মীয় দিক থেকে পাহাড়শ্রেণিতে এই টিলাগুলোর গুরুত্ব গৌণ। তবে অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত এটি চন্দ্র রাজবংশের রাজাদের রাজধানী ছিল বলে এখানে পাওয়া রাজকীয় জাঁকজমক, আড়ম্বর ও শৃঙ্খলার নিদর্শনগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

চন্দ্র রাজবংশের রাজা মানিকচন্দ্রের রানীর নাম ছিল ময়নামতি। তাঁর নামেই এই পাহাড়, অঞ্চল ও রাজ্যের নাম হয় ময়নামতি। রানী ময়নামতি ও তাঁর পুত্র গোপীচন্দ্র বা গোবিন্দচন্দ্র এ অঞ্চলের কিংবদন্তি চরিত্র; তাঁদের নিয়ে অসংখ্য পালাগান ও কাব্য রচিত হয়েছিল। রাজা মানিকচন্দ্রের অনুপস্থিতিতে রানী ময়নামতি প্রায়ই রাজ্য পরিচালনা করতেন। শালবন বিহারের পরম্পরাগত আচার্যগণ, মীননাথ, গোরক্ষনাথ, চৌরঙ্গীনাথ ও জালন্ধরীপাদ (হাড়িপা সিদ্ধা), চন্দ্র রাজবংশের রাজপুরোহিত ছিলেন। এই লেখায় বিভিন্ন স্থানে পাওয়া তাম্রশাসন, স্থানীয় জনশ্রুতি, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত প্রত্নবস্তু এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও কুমিল্লার প্রাচীন ইতিহাস বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনার সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

নীলপদ্ম

জাতিসংঘের ৫০তম বার্ষিকীতে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শালবন বিহারের “নীলপদ্ম” পোড়ামাটির ফলকের একটি প্রতিরূপ উপহার দেন। জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান তখন বলেছিলেন: “সপ্তম থেকে অষ্টম শতকে বাংলার বিহারগুলোতে যখন জ্ঞানের আলো জ্বলছিল, ইউরোপ তখন অন্ধকারে ছিল।” এ থেকেই বোঝা যায় অতীতে কুমিল্লার সংস্কৃতি ও সভ্যতা কতটা গৌরবময় ছিল।

একাডেমির পরিচিতি থেকে

উল্লেখযোগ্য বিহার ও প্রত্নস্থল

পাহাড়শ্রেণির অল্প কয়েকটি প্রত্নস্থলেই এ পর্যন্ত খনন হয়েছে। বাকিগুলো এখনো অপেক্ষায়।

সবুজ ঘাসে ঘেরা শালবন বিহারের খননকৃত ইটের দেয়াল

শালবন বিহার

মানচিত্রে ১৭ নম্বর

কোটিলা মুড়ার (ত্রিরত্ন স্তূপ) ধাপযুক্ত ইটের বেদি

কোটিলা মুড়া (ত্রিরত্ন স্তূপ)

মানচিত্রে ৮ নম্বর

আনন্দ বিহারের ক্রুশাকৃতি কেন্দ্রীয় মন্দির ও বিহারের দেয়াল

আনন্দ বিহার

মানচিত্রে ১০ নম্বর

ইটাখোলা মুড়া বিহারের ইটের সিঁড়ি ও দেয়াল

ইটাখোলা মুড়া

মানচিত্রে ১৩ নম্বর

রূপবান মুড়ার ধ্বংসাবশেষের বিস্তৃত দৃশ্য

রূপবান মুড়া

মানচিত্রে ১৪ নম্বর

ঘাসের মাঠের ওপারে ভোজ বিহারের নিচু ঢিবি

ভোজ বিহার

মানচিত্রে ১২ নম্বর

ঘাসে ঢাকা চারপত্র মুড়ার ইটের দেয়াল

চারপত্র মুড়া

মানচিত্রে ৭ নম্বর

গাছপালায় ঘেরা রানী ময়নামতির প্রাসাদের স্থান

রানী ময়নামতির প্রাসাদ

মানচিত্রে ১ নম্বর

ওপর থেকে দেখা লতিকোট মুড়ার ইটের ভিত্তি

লতিকোট মুড়া

ময়নামতি-লালমাই থেকে উদ্ধারকৃত প্রত্নবস্তু

এই ঐতিহ্যের জন্য একটি গবেষণা কেন্দ্র

দেশ-বিদেশের গবেষক ও পণ্ডিতরা যাতে এই ইতিহাস নিয়ে কাজ করে তা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারেন, সেজন্য আমরা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে চাই।

গবেষণা কেন্দ্র সম্পর্কে